জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে জাতীয় সংসদে। ধরলাম আমরা নিষিদ্ধ হয়ে গেলাম, এই শূন্যস্থান পূরণটা করবে কে? আপনারা কি একাই দেশ চালাবেন? আপনারা কি একদলীয় শাসন কায়েম করবেন? না পারলে, এটা কে পূরণ করবে? আপনারা কি আওয়ামী লীগকে পুনরুত্থান করতে চাচ্ছেন? আমি তো মনে করি আওয়ামী লীগকে পুনরুত্থান করতে চাচ্ছেন। কারণ, চার মাসেও আপনারা একজন লোক খুঁজে পেলেন না যে সেই প্রেসিডেন্ট কে হবে। আপনার ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকই আপনার পছন্দ হয়। তাকেই রাখার চেষ্টা করতেছেন। এত বড় বিএনপি দল, তাকে এত পছন্দ হয় কেন? তারা কি কথা, কোন থেকে ইঙ্গিত পেয়েছেন যে তাকে রাখতে হবে? আমরা জানি না। জনগণের কাছে আপনারা খোলাসা করুন। এবং আপনারা ফ্যাসিস্টকে যদি নির্মূল করতে চান, ফ্যাসিস্টের সবকিছুই চিহ্ন একদম মুছে ফেলুন। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে প্রেসিডেন্টকে আপনারা, আপনাদের দলের প্রেসিডেন্টকে আপনারা এ জায়গায় চুজ করুন।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট এ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি একথা বলেন।

এটিএম আজহারুল ইসলাম বলেন, আজকে বিগত স্বৈরাচার সরকার, অর্ধশতাব্দীর সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে ১৭ বছরে, ২৭ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তাহলে আমরা কীভাবে বলব বাংলাদেশ একটা গরিব? যারা সততার সাথে, দুর্নীতিমুক্ত হয়ে দেশকে তার পরিচালনা না করার কারণেই দেশের সম্পদ লুটপাট হয়েছে, জনগণের কোনো ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। দল ক্ষমতায় এসেছে, নতুন দল ক্ষমতায় আসছে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন আমরা দেখতে পাইনি। আমরা কীভাবে বিশ্বাস করতে পারি আপনারা সেই পথে পা বাড়াবেন না? কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করুন, আপনারা দুর্নীতিমুক্ত হয়ে এই বাজেটটাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করবেন।

তিনি আরো বলেন, আজকে ৩৪৮ জন এমপি একযোগে যদি আমরা শপথ বাক্য পাঠ করিÑ একটি টাকার দুর্নীতি আমরা করব না, তাহলে দুর্নীতি বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সাধারণ অশিক্ষিত লোক দুর্নীতি করেন না, দুর্নীতি করে শিক্ষিত লোকেরাই। কারণ তারাই বিভিন্ন পদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তো কেন শিক্ষিত লোকেরা শিক্ষিত হওয়ার পর দুর্নীতি করেন? তার প্রধান কারণ, আমরা অনেক কিছুই করেছি, উন্নয়ন করেছি, কিন্তু মানুষের মনোজগতের উন্নয়নের জন্য, চারিত্রিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো আমূল পরিবর্তন করি নাই। অতএব এখান দিয়ে আমরা দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষার প্রচলন এখন থেকে না করি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও ক্ষতির দিকে যাতে যেতে পারে, তাহলে তারা কোনো সময় ক্ষমা করবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, উল্লেখ করে, মাননীয় স্পিকার, উনি অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, আমি অনুরোধ করব যারা বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম আমাদের, তরুণ যারা আজকে লেখাপড়া করার জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন, তাদের অন্য অনেক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষার দিকে আপনারা জোর দিন, তাহলে ইনশাআল্লাহ এই বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় দেশ।

তিনি আরো বলেন, আজকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দেশটাকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেওয়ার জন্য, যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের আজকে এই পর্যায়ে এসেছে। কিন্তু আজকে আমরা চার মাসের মধ্যে যা দেখলাম উনাদের কর্মকাণ্ডে, আমরা সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার। আজকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যারা আমরা এমপি রয়েছি, সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার। আমাদের বরাদ্দের মধ্যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কেন করা হচ্ছে? আমরা বলছি সবার আগে বাংলাদেশ। এ কথা অত্যন্ত সুন্দর স্লোগান, কিন্তু কর্মকাণ্ডে কি প্রমাণ হয় সবার আগে বাংলাদেশ? তার আগে বিএনপি, তার আগে বিএনপির এমপিরা। তাহলে আমরা কোথায়? এটা থাকলে তো দেশের ভারসাম্য থাকবে না, বৈষম্য দূর হবে না।

তিনি বাজেট বাস্তবায়ন সর্ম্পকে বলেন, যেকোনো বাজেট সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে মনে হয় না রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তারা চায়। আমরা শপথ নিয়েছি ১৭ই ফেব্রুয়ারি। তাহলে জন্ম হলো তখন, তখনই তো আপনারা শপথ একটা নেন নাই। যে শপথ জনগণের কাছে আপনারা ওয়াদা করেছিলেন, মিটিং-মিছিলে আপনারা বলেছেন, গণভোটের পক্ষে আপনারা প্রচারণা চালিয়েছেন যে আমরা সংসদ আমরা ক্ষমতায় গেলে আমরা সব সংবিধানকে সংবিধান সংস্কার করব। কিন্তু আপনারা এমপি হওয়ার শপথটা গ্রহণ করলেন, কিন্তু সংস্কারের, সংবিধান সংস্কারের শপথটা গ্রহণ করলেন না। তখন থেকেই তো আপনাদের সম্পর্কে জনগণের মধ্যে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। সংস্কারের একটা কাজও আপনারা হাত দিলেন না। সবটাই বন্ধ করলেন। আপনারা সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন বিচার থেকেও কিছু করতে পারলেন না। আইন, বিচার লাইন নিজের হাতে রাখার চেষ্টা করলেন। পুলিশ কমিশনকে মানলেন না আপনারা। আরও অনেক কমিশন হয়েছে, একটাও বাস্তবায়ন করা হয়নি। আশ্বাস শুধু দিচ্ছেন। সে আশ্বাসে মানুষ কতটুকু বিশ্বাস করবে? চার মাসের পরেও তো সে আশ্বাসে আমরা এখনও সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। তা আমরা আমি আমি মাননীয় স্পিকার, আমরা অনুরোধ করতে চাইÑ আপনারা যে বিষয়টা সংসদের মধ্যে ফয়সালা হওয়া উচিত, সেই বিষয়টা সংসদের বাইরে নিয়ে যাবেন না। দেশের জন্য, আপনাদের জন্য, কারোরই ভালো হবে না। আমাদের নেতা, যার ব্যাপারে বলা হয়েছে, উনি বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। আমাকে এখানে অনেক সদস্য বলেছেন, উনি কিসের বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন? বিপ্লবের ডাক দিতে হবে না। এ সত্যিকারে চেতনা যদি ধারণ করেন আর বাস্তবায়ন না করেন, জনগণই বিপ্লব করবে।

তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি যাদের হাত ধরে আমি আমার দলের কাজ শুরু করি, আমার সেই দলের নেতা মরহুম মতিউর রহমান নিজামী, জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জনাব মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, জনাব আব্দুল কাদের মোল্লা, জনাব মীর কাসেম আলী। যাদের অন্যায়ভাবে মিথ্যা, অসত্য মামলা সাজিয়ে জুডিশিয়াল কিলিং এর মাধ্যমে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। যারা এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, আজকে আপনাদের সামনে আমি দাবি জানাতে চাই, যারা যেভাবে যতজন জড়িত আছেন, তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হোক। তাহলে আইনের শাসন কায়েম হবে। সবচেয়ে বড় জুলুমের শিকার আজকে আমরা। কিন্তু আরও কষ্ট লাগে, এই তাদের সেশনেই যখন আমাদেরকে এমনভাবে আক্রমণ করা হয়, মনে হয় যে আমরা এখনও আওয়ামী শাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছি। আমাদের এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, যে বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে, জনগণের কল্যাণের জন্যই উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেই কল্যাণের জন্য উপস্থাপিত বাজেট জনগণের কল্যাণ করবে কি না করবে, তা এখনই বলা যাবে না। কেবল বাজেট আমাদের সামনে পেশ করা হলো, এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণ জানতে পারবে।

বাজেট সর্ম্পকে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট আয় ধরা হয়েছে ৬ লক্ষ, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির প্রায় ৩.০৬ শতাংশ। এই বিশাল আকারের বাজেট বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আহরণে অনিশ্চয়তা, ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচন বাজেট বাস্তবায়নকে কঠিন করে তুলতে পারে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৃহৎ রাজস্ব ঘাটতির মতো বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

তিনি বলেন, সুদ একটি বড় পাপ। এই সুদে জর্জরিত আজকে বাংলাদেশের জনগণ। মডার্ন এক মুসলিম দেশেই সুদ আমরা চলতে দিতে পারি না। সরকার সেই সুদভিত্তিক ঋণের পরিবর্তে যদি ইসলামী শরীয়া মোতাবেক রিটেইল সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প পথ বিবেচনা করতে পারে। সরকার আশা করছে এই বাজেটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচনের ফলে স্বল্পমেয়াদে চাপ কমলেও দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী যদি খেয়াল রাখেন, এই সুকুক অর্থাৎ ইসলামী বন্ড বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চালু হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সরকার যদি বাজেট ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে একক ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে সৃষ্ট ক্রাউডিং আউট ইফেক্টের কারণে বেসরকারি উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, যা আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে এক সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ছিল কম সুদের এবং দীর্ঘমেয়াদি রেয়াতি সুবিধা সম্পন্ন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পথে থাকায় বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ গ্রহণ প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বৈদেশিক ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পেলে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার ঋণ দায়ের একটি বড় অংশ সুদ পরিশোধে এই ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, বলা হচ্ছেÑ আমরা জান্নাতের টিকিট বিক্রি করি। আমি অনুরোধ করব, আমার একটা টিকিট দরকার। কারণ আমি জান্নাতে যেতে চাই। আমাকে টিকিটটাই দেখান জামায়াত যে বিক্রি করছে? সে টিকিট দেখালেই বলব টিকিট বিক্রি করছে। তাহলে কেন এ কথা বলেন? হ্যাঁ, আমরা টিকিট বিক্রি করি। আমাদেরটা না। আল্লাহই বলেছেন টিকিটটা কী। যে বলছেন কী? নামাজ পড়ো, জান্নাতে যাওয়া। রোজা করো, জান্নাতে যাওয়া। এই নামাজ, রোজাটাই টিকিট। এটা আল্লাহই দিয়েছেন। সেই কথাগুলো আমরা মানুষকে বলি। অতএব টিকিট আমরা বিক্রি করি না। জাহান্নামের টিকিট বিক্রি করে কে? এই যে অবান্তর কথাগুলো বলে আপনারা মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না।