রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে পাম্প নির্ভরতা পরিহার করে জলাধার-খালসমূহের সঙ্গে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করাসহ ৭ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে “বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা” শীর্ষক এক সেমিনারে এসব সুপারিশ করা হয়।

‎সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বাপার নির্বাহী সদস্য ও নগরায়ণ কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘বর্ষা এলেই যে ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়, তার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা আর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি বর্ষায় যে পানি জমে, সেটি শুধু আকাশের বৃষ্টির কারণে নয়; আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তহীনতার ফল। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পানির স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘জলাবদ্ধতা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, এটি সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল। সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঢাকাকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব। ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারলে দেশের অন্য শহরগুলোর জন্যও একটি গণবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি হবে।’

‎নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ, সেতু বিভাগ, নৌপরিবহন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে ঢাকার মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারবে না। অংশগ্রহণমূলক নগর শাসনই এর সমাধান।’

‎তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন, সিটি করপোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠন-যেমন ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি), ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (আইএবি), ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) এবং নাগরিকদের নিয়ে ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সবাই অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বয়, অংশীদারিত্ব এবং নাগরিকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।’ সেমিনারে বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, ‘জলাবদ্ধতার সমস্যা সারাদেশের বৃহৎ শহরগুলোর। সরকারি-বেরসরকারি ও জনগণের সমন্বয়ে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সরকারকে সুনির্দিষ্টভাবে সমস্যা চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথ বের করতে হবে।’

‎বাপার সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নাই। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ভুক্তভোগী, পরিবেশবিদ, সচেতন নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি। পরিকল্পনাকারী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে খ-কালীন পরিকল্পনা পরিহার করে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।’

‎ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘ডিজাইনে সাধারণত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৃষ্টির রেকর্ডকে ধরে ড্রেনের আকার করতে হবে। বর্তমানে আমরা দেখি ড্রেনের অর্ধেকের বেশি ময়লায় ভরে থাকে। এতে করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ডিজাইন করার পরিকল্পনা করছি। এটি করা হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে।’

‎বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও পরিকল্পনাবিদ মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘দুর্যোগ তখনই ফিরে আসে যখন মানুষ দুর্যোগের কথা ভুলে যায়। আমাদের পাম্পগুলোকে সচল করতে হবে। পাম্পের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ড্রেনেজ সিস্টেমের আপডেট করতে হবে।’

সেমিনারে বাপা’র সহ-সভাপতি মহিদুল হক খান, জাকির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, হুমায়ুন কবির সুমন, জাভেদ জাহান, নির্বাহী সদস্য হাজী শেখ আনছার আলী, মোনছেফা তৃপ্তি, ফাহমিদা নাজনিনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

‎সেমিনার থেকে উত্থাপিত বাপার ৭টি সুপারিশ হলো-

‎১. ঢাকার কঠিন এবং পয়ঃবর্জ্য সংগ্রহ ও নিকাশ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে কারিগরি দক্ষতা সম্পন্ন পেশাদার নিয়োগ।

২. বর্তমান ভূ-প্রাকৃতিক ঢাল এবং উচ্চতা বিবেচনায় নিয়ে সড়ক পার্শ্বস্থ ড্রেন ভিত্তিক বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভূ-গর্ভস্থ সুয়ারেজ লাইন সম্প্রসারণ করে সম্পূর্ণ নগরীকে পয়ঃবর্জ্য নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা।

৩. জলাবদ্ধতা মোকাবেলায় বিচ্ছিন্ন প্রকল্প গ্রহণ না করে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা, ডিজিটাল এলিভেশন মডেল (ডিইএম), হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেলিং এর মাধ্যমে নদী, খাল, লেক, জলাভূমি, জলধারণ এলাকা ও নিষ্কাশন নালাকে একটি আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার মধ্যে নিতে হবে।

৪. নদী-খাল- জলাধার সংরক্ষণে বৈধ-অবৈধ দখলের স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাস ও ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন, পুনর্বাসন নীতি, ক্ষতিপূরণ কাঠামো এবং ভবিষ্যতে পুনর্দখল স্থায়ীভাবে রোধের জন্য জনসম্পৃক্ততা ও দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নদী-খাল- জলাধারকে নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে পুনঃস্থাপন করা।

‎৫. যে কোনো অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ প্রভাব মোকাবেলায় ওয়াটারশেড ও ক্যাচমেন্ট এরিয়া নির্ধারণপূর্বক বিকল্প নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নসহ বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনে পাম্প নির্ভরতা পরিহার করে জলাধার-খাল সমূহের সাথে নদীর সংযোগ উন্মুক্ত করা।

‎৬. দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে ঐসকল সংস্থার পাশাপাশি অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠন (আইইবি, আইএবি, বিআইপি) সমূহকে কারিগরি সহযোগী হিসেবে যুক্ত করে একটি প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা।

‎৭. সর্বোপরি, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন একক প্রকল্প হিসেবে গণ্য না করে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রকৌশলগত বাস্তবভিত্তিক সমাধান নিশ্চিত করা।