সাদিক এগ্রোর বিরুদ্ধে সিআইডির দায়ের করা ১৩৩ কোটি টাকার অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) মামলার চূড়ান্ত অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) অবৈধ সম্পদের পরিমাণ কমিয়ে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৬৮ টাকা (প্রায় দেড় কোটি টাকা) করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত শেষ করে এই সংশোধিত অভিযোগপত্রটি আদালতে দাখিল করেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক জানান, প্রাথমিক মামলা করার সময় সাদিক এগ্রোর ব্যাংকের মোট লেনদেনের পরিমাণকে (১৩৩ কোটি টাকা) ভুলবশত অপরাধলব্ধ বা পাচার করা অর্থ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল।
দীর্ঘ তদন্তের পর সিআইডি নিশ্চিত হয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটি জালিয়াতি, চোরাচালান ও সরকারি জমি দখলের মতো অপরাধের মাধ্যমে মূলত ১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৬৬৮ টাকা মূল্যের অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছে।
সিআইডির তদন্তে প্রমাণিত অন্যান্য অপরাধ
টাকার পরিমাণ কমলেও সিআইডির তদন্তে সাদিক এগ্রোর বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে:
ব্রাহমা গরু আমদানি ও অর্থ পাচার: নীতিমালা লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়।
সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ: রমজানে স্বল্পমূল্যে মাংস বিক্রির জন্য সরকারিভাবে বাজেয়াপ্ত ১৫টি ব্রাহমা গরু ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া হয়েছিল। সাদিক এগ্রো কাগজে-কলমে সেগুলো জবাই দেখিয়ে ৬টি মূল্যবান গরু আত্মসাৎ করে এবং কোরবানির হাটে বিক্রির চেষ্টা চালায়।
সরকারি খাল ও রাস্তা দখল: মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খালের সরকারি জমি এবং বেড়িবাঁধের রাস্তা ভরাট ও দখল করে খামার গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমে তারা ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯১৮ টাকা অপরাধলব্ধ আয় করে।ট্যাক্স ফাঁকি: সাদিক এগ্রো ২০২১ সালে ই-টিআইএন (e-TIN) নিলেও সিআইডির তদন্ত চলা পর্যন্ত কোনো আয়কর রিটার্ন দাখিল করেনি।
বর্তমান আইনি পরিস্থিতি
মামলার মূল আসামি সাদিক এগ্রোর চেয়ারম্যান মো. ইমরান হোসেন বর্তমানে কারাগারে আছেন (এর আগে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছিলেন)। তবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম এখনো পলাতক।অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটির ২৭টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১ জুন ঈদুল আজহার আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাতের ১৫ লাখ টাকায় ছাগল কেনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাদিক এগ্রো আলোচনায় আসে। এরপরই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাদিক এগ্রো ভুয়া আমদানি অনুমতিপত্র তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনুমোদনহীন ১৮টি ব্রাহমা জাতের গরু আমদানি করে। এই অবৈধ আমদানির মাধ্যমে প্রায় ৮৬ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সিআইডি উল্লেখ করেছে। জব্দ করার পর সরকারিভাবে জবাই করার জন্য দেওয়া ১৫টি গরুর মধ্যে ছয়টি আত্মসাৎ করে কোরবানির হাটে বিক্রির চেষ্টারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এছাড়া, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল ও বেড়িবাঁধ সড়কের পাশের সরকারি জমি দখল করে খামার পরিচালনার মাধ্যমে সাদিক এগ্রো ৮৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আয় করেছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কর শনাক্তকরণ নম্বর নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো আয়কর রিটার্ন জমা দেয়নি।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে জানা যায়, সাদিক এগ্রোর মালিক ইমরানের সঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অভিযোগ রয়েছে, গরুর ব্যবসার আড়ালে তিনি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন এবং কর্মকর্তাদের ঘুষের টাকা লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতেন।
এই মামলায় সাদিক এগ্রোর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল আলম পলাতক।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৩ মার্চ মোহাম্মদপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করেছিল সিআইডি। অন্যদিকে, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় মতিউর রহমান ও তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজও কারাগারে রয়েছেন।