সংগ্রাম ডেস্ক

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব ও ডেইলি ওয়াদা পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেছেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জাতিসংঘকে দিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জাতিসংঘের নিরপেক্ষ তদন্তের কারণে এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।

গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘জুলাই রেভুলেশন অ্যালায়েন্স’ আয়োজিত ‘অ্যাকাউন্টিবিলিটি, জাস্টিস অ্যান্ড হিলিং ইন পোস্ট জুলাই বাংলাদেশ’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুল আলম বলেন, প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও তার মন্ত্রিসভা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে জুলাই হত্যাকা-ের তদন্ত জাতিসংঘের মাধ্যমে করা হবে। তিনি বলেন, জাতিসংঘ অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে ১২৭ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতটাই শক্তিশালী এই প্রতিবেদন যে বিশ্বের কোনো শক্তিই এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে না।

তিনি দাবি করেন, যদি এই তদন্ত আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিবর্তে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠান দিয়ে করানো হতো, তাহলে প্রতিবেদনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হতো এবং বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করে তা বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু জাতিসংঘের তদন্তের কারণে সেই সুযোগ তৈরি হয়নি।

জুলাই হত্যাকা-ে জড়িতদের বিচারের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের আহ্বান জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া উচিত নয়। তারা পৃথিবীর যেখানেই অবস্থান করুক, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার জন্য একটি শক্তিশালী ও নিবেদিতপ্রাণ সংস্থা গঠন করা প্রয়োজন।

শফিকুল আলম বলেন, বাংলাদেশে অতীতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এবার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যারা হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের আগে দায় স্বীকার ও ক্ষমা চাইতে হবে। যারা এখনো তাদের অপরাধ স্বীকার করেনি বা ক্ষমা চায়নি, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস হতে পারে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, গত ১৮ মাস ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই সময়ে নিহত ও আহতদের শনাক্ত করা এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কোনো ক্ষতিপূরণই স্বজন হারানোর বেদনার সমান হতে পারে না।

একই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে জুলাই শহীদ শেখ ফাহমিন জাফরের মা কাজী লুলুল মাকমিন বলেন, ১৮ জুলাই বিএনএর সামনে আন্দোলনে যাওয়ার আগে তাকে তার ইন্টার পড়ুয়া শেখ ফাহমিন জাফর বলেছিলো- ‘মা, আমি রাজপথে যাচ্ছি। যদি মারা যাই, তাহলে রাজপথ থেকে আমার লাশ উঠাবে না, যতক্ষণ না আমার দাবি মেনে নেওয়া হয়।’ সন্তানের সেই কথাই তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।

কাজী লুলুল মাকমিন বলেন, হাসপাতালে ছেলের লাশের সঙ্গে থাকা একটি চিরকুট তার হাতে আসে। ফাহমিন লিখেছিল, ‘রক্ত যখন দিয়েছি তোর স্বাধীন দেশে, রক্ত দিয়ে আবারও স্বাধীনতা আনব।’ সেই বিশ্বাস বুকে নিয়েই আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু যে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন নিয়ে সে প্রাণ দিয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।

তিনি বলেন, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি নয়, বরং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। যারা হত্যাকা-ে জড়িত এবং প্রভাব খাটিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তাদেরও বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অভিযুক্তদের রক্ষা করার যেকোনো চেষ্টা বন্ধ করতে হবে।

সন্তানের শেষ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কাজী লুলুল মাকমিন বলেন, আন্দোলনে যেতে বাধা দেওয়ায় মৃত্যুর আগের দিন ছেলে তার সঙ্গে অভিমান করে সারাদিন কথা বলেনি। সেই শেষ অভিমান ও অসমাপ্ত কথাগুলো আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।