দীর্ঘ বিরতির পর দেশে আবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও আচরণবিধি দ্রুত চূড়ান্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত খবর সূত্রে জানা যায়, আগামী অক্টোবর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় এবং হাজার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচন আয়োজনের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন কতটা অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে।

বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনই রাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক স্তর, যেখানে জনগণ সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে। ফলে এই নির্বাচন যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপরও পড়ে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে বিশেষ করে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জনমনে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় সরকারের আওতাধীন প্রতিটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল, প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক পক্ষপাত, বিরোধী প্রার্থীদের বাধা এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ বারবার উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। ফলে জনগণের একটি বড় অংশ স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কার্যত অর্থহীন বলে মনে করতে শুরু করে। এই আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠাই বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও কমিশনের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক জেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা চলছে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা গণতান্ত্রিক চর্চাকে দুর্বল করে। প্রশাসক নিয়োগ যদি নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।

এ কারণেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান ও আইন অনুযায়ী কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এই স্বাধীনতা কেবল সাংবিধানিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তব কর্মকা-ে প্রতিফলিত হতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, নির্বাচনী সহিংসতা ও প্রভাব বিস্তার প্রতিরোধ, নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিটি প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেওয়া কমিশনের মৌলিক দায়িত্ব। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করতে পারলেই কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন তাই শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। সাহসী, নিরপেক্ষ ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে তারা যদি একটি গ্রহণযোগ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপহার দিতে পারে, তবে শুধু স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই শক্তিশালী হবে না, দেশের গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থাও অনেকাংশে পুনরুদ্ধার হবে।