সা ক্ষা ৎ কা র : মো. কাজিম উদ্দিন

বীমা শিল্পে একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ও অন্যতম সংগঠক মো: কাজিম উদ্দিন। তার দক্ষতা, সততা আর নিষ্ঠা তাকে দেশের বীমা খাতের অতিপরিচিত নাম ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসি আজ সাফল্যের শীর্ষে । দেশের বীমা খাতের অতিপরিচিত নাম ন্যাশনাল লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসি। ১৯৮৫ সালে বেসরকারি খাতে প্রথম জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবসা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটির কার্যক্রমের শুরুর এক বছর পর ১৯৮৭ সালে এজেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন মো. কাজিম উদ্দিন।

সেখান থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে কোম্পানির বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্যদিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন দক্ষ লিডার হিসেবে। তার সেই এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালের জুনে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ কাজিম উদ্দিনকে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব দেয়। কাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে বীমা বিক্রিতেও ঈর্ষণীয় অবস্থানে চলে গেছে ন্যাশনাল লাইফ। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত প্রায় ৭২ লাখ পলিসি বিক্রি করেছে। কোম্পানির সর্বমোট বিনিয়োগ ৫ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা আর মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা।

দেশের আর্থিক খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বীমা শিল্পের সম্ভাবনা যেমন বিস্তৃত, তেমনি রয়েছে নানা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও। বাজারের আকার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারের রাজস্ব আহরণে এই খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। তবে আস্থার সংকট, দাবি পরিশোধে বিলম্ব এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা এসব কারণে প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারছে না বীমা শিল্প। বর্তমান বাস্তবতা, সংকট এবং সম্ভাবনা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সঙ্গে কথা বলেছেন ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কাজিম উদ্দিন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার কামাল উদ্দিন সুমন।

দৈনিক সংগ্রাম: বীমা খাতটির মৌলিক সংকটগুলো কী কী ?

মো. কাজিম উদ্দিন: বর্তমানে বীমা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। এর মূল কারণ, কিছু কোম্পানি সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে এবং নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া দক্ষ জনবলের অভাব, দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিক্রয়চাপ খাতটির সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে ইতিবাচক দিকও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠান মেয়াদোত্তর ও সারেন্ডার দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করছে। মৃত্যুদাবির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা পড়লে সাধারণত এক মাসের মধ্যেই পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগ খাতে আস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক সংগ্রাম: খাতটির উন্নয়ন হবে এবং রাজস্ব বাড়ার উপায় কি?

মো. কাজিম উদ্দিন: বীমা খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। আর এর জন্য সময়মতো দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনকে আরও কার্যকর ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। যেসব কোম্পানি নিয়মিত দাবি পরিশোধে ব্যর্থ, তাদের ওপর কঠোর তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংকাসুরেন্স কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা গেলে সহজেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বীমার আওতায় আনা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে, মানুষের আস্থা বাড়লে প্রিমিয়াম আয় বাড়বে, খাতের পরিধি সম্প্রসারিত হবে এবং সরকারের রাজস্বও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

দৈনিক সংগ্রাম: বীমা খাতের বাজারের আকার কত, কর্মসংস্থান কেমন, সরকার কত টাকার রাজস্ব পায়?

মো. কাজিম উদ্দিন: বীমা খাত দেশের আর্থিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ২০২৫ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের লাইফ ইন্স্যুরেন্স খাতের মোট প্রিমিয়াম আয় বা বাজারের আকার প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। দেশে কার্যরত ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি একাই প্রায় ১৮ শতাংশ বাজার দখল করে রেখেছে। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৭৫ লক্ষাধিক মানুষকে বীমা সেবার আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও খাতটির অবদান উল্লেখযোগ্য। জীবন বীমা কোম্পানিগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন। এছাড়া এজেন্ট ও কমিশনভিত্তিক কাজে যুক্ত রয়েছেন আরও প্রায় ১০ লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বীমা খাত একটি বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও খাতটির গুরুত্ব বাড়ছে। ২০২৫ সালে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা মিলিয়ে ভ্যাট, ট্যাক্স ও স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ সরকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকাসুরেন্স চালু হওয়ায় ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা বিক্রির সুযোগ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে প্রিমিয়াম আয় ও সরকারের রাজস্বÍউভয়ই বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

দৈনিক সংগ্রাম: বীমা খাতের সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে কি পদক্ষেপ নেয়া দরকার ?

মো. কাজিম উদ্দিন: বীমা খাতের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয়েছে, তাই এর সমাধানও ধাপে ধাপে করতে হবে। প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো গ্রাহকের দাবি দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নির্ভরযোগ্যভাবে পরিশোধ নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি জোরদার করতে হবে এবং দুর্বল কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি পর্যায়ে বীমা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে কার্যকর প্রচারণা চালানো জরুরি। প্রয়োজনে সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোকে শর্তসাপেক্ষে সহায়তা দিয়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা যেতে পারে। মিডিয়ার ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বীমা খাতের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে পারলে মানুষের আস্থা বাড়বে এবং খাতটির প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।

তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৪ বছরে যেখানে কোম্পানির লাইফ ফান্ড ছিল ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানির লাইফ ফান্ড হয়েছে ৬ হাজার ২৯ কোটি টাকা। শুধু লাইফ ফান্ডই নয়, দাবি পরিশোধেও চমক দেখিয়েছে ন্যাশনাল লাইফ। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত কোম্পানি ১১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধ করেছে। শুধু ২০২৪ সালেই দাবি পরিশোধ করেছে ১২০৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে দাবি পরিশোধ করেছে ৩২৯ কোটি টাকা। ইতিবাচক ব্যবসা, গ্রাহকের আস্থা অর্জন ও সময়মতো দাবি পরিশোধ করায় কাজিম উদ্দিনের হাত ধরে ন্যাশনাল লাইফ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছে।

কাজিম উদ্দিন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ন্যাশনাল লাইফ দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে অন্তত ২৫টি প্রেস্টিজিয়াস পুরস্কার অর্জন করেছে। এরমধ্যে দেশ থেকে পেয়েছে ১৪টি পুরস্কার।

সেগুলো হলো- ৮ম আইসিএসবি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২০; ৯ম আইসিএসবি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২১; ১০ম আইসিএসবি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২২; ১১ম আইসিএসবি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; ১২ তম আইসিএমএবি বেস্ট কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড-২০২১; ১৩ তম আইসিএমএবি বেস্ট কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড-২০২২; ১৪ তম আইসিএমএবি বেস্ট কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; ২৩ তম আইসিএবি বেস্ট কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড-২০২২; ২৪ তম আইসিএবি বেস্ট কর্পোরেট অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; এফবিসিসিআই বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; শীর্ষ করদাতার সম্মাননা (২০২১-২০২২) অর্থবছর; শীর্ষ করদাতার সম্মাননা (২০২২-২০২৩) অর্থবছর; বীমা দাবি পরিশোধে জাতীয় সম্মাননা-২০২৩ এবং বীমা দাবি পরিশোধে জাতীয় সম্মাননা-২০২৪।

এছাড়াও কাজিম উদ্দিনের হাত ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে ন্যাশনাল লাইফ পেয়েছে ১১টি পুরস্কার।

সেগুলো হলো- সাউথ এশিয়ান বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২১; সাউথ এশিয়ান বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২২; সাউথ এশিয়ান বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব একাউন্টস (সাফা) অ্যাওয়ার্ড-২০২২; সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব একাউন্টস (সাফা) অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; ইমার্জিং এশিয়া ইন্স্যুরেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২১; ইমার্জিং এশিয়া ইন্স্যুরেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২২; প্রেস্টিজ অ্যাওয়ার্ড, ইংল্যান্ড; কমনওয়েলথ বিজনেস এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৩; সিএমও এশিয়া ইন্স্যুরেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২২ এবং এশিয়া’স বেষ্ট কোম্পানি অব দি ইয়ার অ্যাওয়ার্ড-২০২২ বার্কশায়ার মিডিয়া, আমেরিকা।