টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাংলাদেশের ৭টি জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৪৪ থেকে ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ১০ লাখ ২২ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গত পরিবারগুলো পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। এই জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ।
এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সাঙ্গু নদী বান্দরবান (বান্দরবান) ও দোহাজারী (চট্টগ্রাম), কুশিয়ারা নদী মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ও ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট), সোমেশ্বরী নদী কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নি¤œাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা কিছুটা অবনতি হতে পারে।
আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে এবং উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয় প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে।
বন্যায় প্রায় ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় দিন পার করছে। দুর্গতদের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সড়ক ভেঙে পড়ায় এবং বিদ্যুৎ না থাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় সমস্যা হচ্ছে। অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রান্না করতে পারছে না। খাবার ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চল থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে সরকার বন্যাকবলিত জেলাগুলোর জন্য ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং প্রায় ২ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে।
বন্যাকবলিত ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন
টানা কয়েকদিনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতিতে উদ্ধার তৎপরতা ছাড়াও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও চিকিৎসা সহায়তায় ১১ জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এই জেলাগুলো হলো- কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুর। গতকাল রোববার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তর থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের উদ্ধার, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা প্রদান ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুর জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এই ১১ জেলায় মোট ৯০টি পয়েন্টে সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিজিবি। সেই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বান্দরবানের বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা থেকে ইতোমধ্যে ১১৬ জন পর্যটকসহ ১২২টি পরিবারের ৬ শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ ও ৪৮ জনকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়েছে বিজিবি। পাশাপাশি বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে উপরেপড়া গাছ ও ধ্বংসাবশেষ অপসারণে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে তারা। এছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়িতে ভূমিক্ষয়ের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়া স্টিলের সেতু রক্ষায় জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনসাধারণের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করছে বিজিবি।