মুহাম্মদ নূরে আলম: তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এক নতুন ধাপে উন্নীত হলো। দুই দেশের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে ১৪ দফার একটি যুগান্তকারী যৌথ ইশতেহার। আলোচিত ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিএমবিসি), চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং উত্তরবঙ্গের ভাগ্যবদলকারী ‘তিস্তা প্রকল্প’ নিয়ে এসেছে বড় ধরনের সুখবর। বাংলাদেশ থেকে চীনে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শতভাগ শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় বেইজিংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ঢাকা। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে আবারও চীন অনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধুত্বে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বেইজিংয়ে শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে চীন বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু’। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও কূটনৈতিকরা এই সফরকে বাংলাদেশের জন্য পূর্বদিক থেকে অফুরন্ত সহযোগীতার দুয়ার খুলে যাওয়ার সম্ভনা দেখছেন। এই ঐতিহাসিক সফরের কৌশলগত দিক, নিরাপত্তা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ করছেন সফরের নানান দিক নিয়ে। তারা বলছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভারতের সাথে ভারসাম্য রক্ষা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও মালিকানা অক্ষুণœ রাখা এবং ড. ইউনূসের সময় শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এটা সরকারের একটি বড় সাফল্য।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো চীন সফর শেষে গত শুক্রবার রাতে বেইজিং থেকে ঢাকায় ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের শেষ দিনে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ দ্বিপাক্ষিক ও একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ঘোষণা করেন, বিশ্বে যেকোনো পরিবর্তনই আসুক না কেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের ‘বিশ্বস্ত ভালো বন্ধু,’ ‘সুপ্রতিবেশী’ আর ‘ভালো অংশীদার’ হিসেবেই থাকবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেইজিং-ঢাকা সম্পর্কের উন্নয়নকে চীন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখ-তা রক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সমর্থন আগের মতোই অব্যাহত থাকবে। এই সফরে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘রোহিঙ্গা সংকট’ বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য চীন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং বেইজিংকে মধ্যস্থতায় আনার এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তিটি তৈরি হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময় থেকেই। ড. ইউনূসের সেই সফল কূটনৈতিক উদ্যোগকে বর্তমান নির্বাচিত সরকার আরও এগিয়ে নিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে একটি দৃঢ় দ্বিপাক্ষিক প্রতিশ্রুতি আদায়ে সক্ষম হলো।

ত্রিদেশীয় করিডোর এবং দুই বন্দরের আধুনিকায়ন: এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল যোগাযোগ ও অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়াতে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিসি) গড়ে তোলার প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টাগণ জানান, এই করিডোরটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় চীনের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হয়ে সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে যুক্ত হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসবে। এর পাশাপাশি চীন বাংলাদেশের প্রধান দুই সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে কাজ করার তীব্র আগ্রহ দেখিয়েছে। বেইজিং চায় চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আধুনিক আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য তোরণ হবে।

১৪ দফার যৌথ ইশতেহারের মূল অর্জনসমূহ: সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। এর প্রধান দিকগুলো হলো: উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে’ চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দ্রুত এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) শেষ করা হবে। বাংলাদেশ থেকে চীনে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শতভাগ শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় বেইজিংয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে ঢাকা। দুই দেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একটি নিয়মিত ‘কৌশলগত সংলাপ’ এবং একই সঙ্গে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে।

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, “মিয়ানমারের রাখাইনে জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান যুদ্ধ এই করিডোরের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে মনে রাখতে হবে, রাখাইনের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর চীনের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এটি নিয়ে গভীর নিরাপত্তা মূল্যায়ন করছে। চীন যদি রাখাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হবে।”

চীন-মালয়শিয়া সফর পরবর্তী ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, “এক-চীন নীতির প্রতি সমর্থন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই রয়েছে। এটি নতুন কিছু নয়। তবে এর বিনিময়ে এবার আমরা চীনের কাছ থেকে শতভাগ শূন্য শুল্ক সুবিধা আদায় করতে পেরেছি, যা আমাদের তৈরি পোশাক ও কৃষি পণ্যের জন্য চীনের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করবে। এছাড়া তিস্তা প্রকল্পের মতো মেগা প্রজেক্টে চীনের সরাসরি অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির বড় ভিত্তি তৈরি হয়েছে এই নীতিগত অবস্থানের কারণেই।” পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “বাংলাদেশ সরকার দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করবে না। শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনো দেশের মতো আমরা কোনো বন্দর চীনের হাতে লিজ বা পরিচালনার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দিচ্ছি না। বন্দরগুলোর শতভাগ মালিকানা, প্রশাসনিক ও পরিচালন নিয়ন্ত্রণ থাকবে বাংলাদেশের হাতে। চীন কেবল প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণে বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করবে।”

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। এই করিডোরটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক, কোনো সামরিক জোট নয়। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হওয়া আমাদের সার্বভৌম অধিকার। আমরা বেইজিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াবো, আবার নয়াদিল্লির সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবো। এখানে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি নয়।”

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সাংবাদিকদের বলেন, “আগামী ৩ মাসের মধ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি যৌথ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা হবে। তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চীনা প্রকৌশলী দল আগামী দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সফর করবেন। আমরা আশা করছি, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তিস্তা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন কাজের দৃশ্যমান প্রথম অগ্রগতি দেশের মানুষ দেখতে পাবে।’’ এছাড়াও ইউনূয়ান প্রদেশের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয়-রাখাইন হয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সংযোগ এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীনের আগ্রহ।

বাংলাদেশ ও চীন বিষয়ে সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো: সাহাবুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বেইজিং সফরটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে চীনের মতো পরাশক্তির বিশাল বিনিয়োগ ও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা আমাদের সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। উত্তরবঙ্গের মানুষের তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য অধিকার এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের এই ভূমিকা দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণের দিকে নিয়ে যাবে। সার্বিকভাবে, এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত চুক্তি ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্বার্থেই ভূমিকা রাখবে।