জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি এবং অধিবেশন কক্ষের ভেতরে ছোট ছোট গ্রুপে গল্প বা শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় যেকোনো কাজের চেয়ে সংসদ অধিবেশন বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি অন্য সবকিছুর ওপর প্রাধান্য পায়। মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে সংসদ এড়িয়ে যেতে পারেন না উল্লেখ করে স্পিকার তাদের যথাসময়ে সংসদে এসে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য শোনার এবং প্রয়োজনে প্রতিকার করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে জবাবে তিনি একথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদটা আমাদের কাছে জাতির আমানত। প্রথম দিক থেকেই আপনি আহ্বান জানিয়ে এসেছেন আমরা সবাই যেন পার্টিসিপেশন করে এই সংসদটাকে প্রাণবন্ত রাখি। দুটা জিনিস এখানে লক্ষণীয়, যেটা সংসদের মেজাজের সাথে যায় কিনা আপনি সিদ্ধান্ত দেবেন। একটা হলো যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা, সংসদ সদস্যদের কথাগুলো যাদের নিজের কানে সরাসরি শোনা দরকারÑবিশেষ করে মন্ত্রিপরিষদের সম্মানিত সদস্যবৃন্দÑঅনেক সময় দেখি যে যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কে কথা বলছে, সেই মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কেউ এখানে উপস্থিত নেই। তো এই যে অনুপস্থিতিদের একটা ব্যাপার, বিশেষ করে সিনিয়র লিডারদের, এইটা আমাদেরকে আহত করে। দুই নম্বর, সংসদ চলাকালীন সময়ের মাঝে মাঝে আমরা লক্ষ্য করি কোনো কোনো জায়গায় চার-পাঁচজন মিলে আরেকটা মিটিংয়ের মতো চলতেছে। একদিকে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হচ্ছে, আপনি নিজে অ্যাটেনশন দিচ্ছেন, আমরা বোঝার শোনার চেষ্টা করতেছি, আবার ওইদিকে এগুলোও চলতেছে। এগুলাতে সংসদের ডিসেন্সি যেমন নষ্ট হয়, তেমনি আমরা যারা সংসদকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি আমাদের মনোযোগও নষ্ট হয়। এই বিষয়ে আপনি কিছু বলবেন কিনা, কোনো উদ্যোগ নিবেন কিনা? ধন্যবাদ মাননীয় স্পিকার।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, উত্থাপিত প্রথম প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজেট অধিবেশন চলছে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীÑবিশেষ করে যাদের সম্পর্কে এলাকার দাবি-দাওয়া নিয়ে মাননীয় সদস্যগণ বক্তব্য রাখেন, যেমন হাসপাতালের কারণে, হাসপাতালের অব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে তারা অনেক কিছু বলেন; আইনশৃঙ্খলা প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও কিছু বলেন এবং এলজিআরডি মন্ত্রী অবশ্যই এখানে থাকেন, তার ব্যাপারে সবসময়ই তারা দেয়Ñতো কালকে এই প্রশ্নটি আলোচিত হয়েছিল এবং মাননীয় চিফ হুইপ বলেছিলেন যে তারা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত। তো যাই হোক, আমি আবারও আজকে তাগিদ দিলাম, কোনো রাষ্ট্রীয় কাজ সংসদ অধিবেশনের চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকা-ের মধ্যে সংসদ অধিবেশন সবচাইতে বেশি গুরুত্ব পায় এবং "It takes precedence over any other business of the State." সুতরাং, আপনি মাননীয় মন্ত্রীদেরকে বলবেন তারা যেন সংসদে যথাসময়ে আসেন। সংসদ সদস্যদের যেসব বক্তব্যে তাদের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কথা তারা বলেন, সেগুলোর ব্যাপারে তারা অন্তত শুনবেন এবং যদি সম্ভব হয় তার প্রতিকার করার চেষ্টা করবেন।
দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলের নেতা যেটি বলেছেন, আমি মাঝে মাঝে দেখি সংসদে ছোট ছোট গ্রুপে কথাবার্তা চলে। ফ্লোর ক্রসিংও দুই-একবার দেখেছি, সেগুলো আমি সাথে সাথে পয়েন্ট আউট করেছি। আপনারা সংসদের মধ্যে গ্রুপ আলোচনা করার চেষ্টা করবেন না এবং যতটুকু সম্ভব নিজের আসনে বসে সংসদ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার, অন্তত ভালোভাবে শোনার চেষ্টা করবেনÑএটাই আমরা আশা করি। সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আপনাদের সকলের সহযোগিতা কামনা করি।
গতকাল অধিবেশনের শুরুতে রাজশাহী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান এক নোটিশে জানান, সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে অন্য সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদের নাম ও যোগাযোগ নম্বর পাওয়া খুবই জরুরি। সাধারণত শপথ গ্রহণের দুই-এক মাসের মধ্যেই এই ক্যাটালগ বই প্রকাশ করা হলেও এবার চার মাস পার হতে চললেও তা পাওয়া যায়নি। জবাবে স্পিকার জানান, জাতীয় সংসদ সচিবালয় টেলিফোন সহায়িকা ২০২৬ প্রকাশের কাজ চলমান রয়েছে এবং বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য এখনো তথ্য না দেওয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করা হলেই যথাসময়ে এই ডাইরেক্টরি প্রকাশিত হবে জানিয়ে দ্রুত তথ্য জমা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান স্পিকার।
এই প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, মন্ত্রণালয়গুলোর সঠিক যোগাযোগ নম্বর না থাকার কারণে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক কাজে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডায়েরি বা ডাইরেক্টরি তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ টেলিফোন নাম্বার সংবলিত একটি সম্মিলিত ডাইরেক্টরি সংসদ সদস্যদের সুবিধার জন্য দ্রুত প্রস্তুত করা হবে।
এরপর পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাসের শারীরিক অবস্থা ও সংসদ সদস্য হিসেবে তার সর্বশেষ পরিস্থিতি, ঋণখেলাপি মামলায় থাকা অন্য দুজন সরকারি দলীয় সংসদ সদস্যের অবস্থান এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু ও গুজব প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি করেন।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, সরকারি দলীয় চিফ হুইপের পক্ষ থেকে একটা বার্তা এখানে পেয়েছি যে, বাজেট অধিবেশনকে প্রাণবন্ত করার লক্ষ্যে আমাদের সকলের উপস্থিতি এবং এখানে মনোযোগের সাথে নিয়মিত অবস্থান করাÑএ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আমি দুটো বিষয় আমার জানার বিষয়। একটা হচ্ছে যে, আমরা শুরু থেকেই তার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করি, আমাদের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং এই সংসদের একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, জনাব মির্জা আব্বাস। তার শারীরিক সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এই পার্লামেন্ট এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা কিছু জানতে পেরেছি, এটা আমার মনে পড়ছে না। আমার প্রথম কথা হচ্ছে যে এ বিষয়ে তার সর্বশেষ পরিস্থিতি, পার্লামেন্টে তার শপথ গ্রহণ এবং তার শারীরিক সর্বশেষ অবস্থা। দ্বিতীয় হচ্ছে, সরকারি দলীয় আরো দুজন সংসদ সদস্য যারা ঋণখেলাপি অবস্থায় আছেন, মামলা চলমান রয়েছেন, সেই বিষয়টিও এখানে সর্বশেষ পরিস্থিতি আমাদের সামনে আমার মনে হয় আমরা একজন সংসদ সদস্য হিসেবে জানা দরকার যে উনারা এখনো পর্যন্ত পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করা কিংবা না করার প্রশ্নে তারা কি ভূমিকা পালন করতে পারছেন।
তিনি বলেন, জনাব মির্জা আব্বাস মাননীয় সংসদ সদস্য, তার ব্যাপারে যেসব গুজবের ডালপালা আছে, শহীদ শেখÑআমাদের শরীফ ওসমান হাদী প্রসঙ্গে এবং সেই গুজবে ঘিতে মানে আগুনে ঘি ঢেলেছে সর্বশেষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে বক্তব্য ছিল যে, "আমি যদি নাম বলে দেই তাহলে বাংলাদেশে এটা নিয়ে উথাল-পাতাল হবে।" আমার মনে হয় সেই সব প্রসঙ্গগুলোতে আমরা আর সামনে বাড়তে না দেওয়ার জন্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে ব্রিফ আমাদের কাছে আসা প্রয়োজন ছিল।
আমি তিনটি বিষয় নিয়ে আসছি: একটা হচ্ছে আমাদের বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জনাব মির্জা আব্বাস, উনার উনার বিষয়ে সর্বশেষ জানা প্রয়োজন। দ্বিতীয় হচ্ছে আমাদের যে দুজন ঋণখেলাপি সরকারি দলীয়, তাদের বিষয়টি। এবং সর্বশেষ শরীফ ওসমান হাদী শহীদ, তার বিচারের যে প্রসঙ্গটি এসেছিল, এ ব্যাপারে যে গুজব আছে সে ব্যাপারে জানা প্রয়োজন।
তবে চিফ হুইপ এর বিরোধিতা করে বলেন, এসব অপ্রাসঙ্গিক ও বাইরের বিষয় নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে কথা বলে সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। স্পিকারও চিফ হুইপের বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে জানান, মির্জা আব্বাস চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে তার অবস্থা ক্রমাগত ভালো হচ্ছে এবং সুস্থ হলে তিনি সংসদে আসবেন। গুজব বা আদালতে চলমান মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে সংসদ সময় নষ্ট করতে পারে না উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, কোনো সদস্যের সদস্যপদ পদচ্যুত হলে তা যথাসময়ে সংসদকে জানানো হবে।