কামরুজ্জামান হিরু
টানটান উত্তেজনা, পেনাল্টি মিসের নাটকীয়তা আর শেষমেশ কিংবদন্তি লিওনেল মেসির জাদুকরী রূপকথায় অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২ বা নকআউট পর্ব নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্রুপ ‘জে’-এর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে জোড়া গোল করে ফুটবল ইতিহাসের একাধিক রেকর্ড নিজের নামে করে নিলেন মহাতারকা লিওনেল মেসি।
অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে শেষ ৩২-এর টিকিট নিশ্চিত করলেও আর্জেন্টিনার অপেক্ষা ছিল গ্রুপ-সেরা হওয়ার সমীকরণটি মেলানোর। শেষ পর্যন্ত সেটিও মিলে গেছে। একই গ্রুপের অন্য ম্যাচে আলজেরিয়ার কাছে জর্ডান হেরে যাওয়ায় ‘জে’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের। আর গ্রুপ-সেরা হওয়ার পর থেকেই নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে হচ্ছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর জল্পনাকল্পনা।
টুর্নামেন্টের ড্র অনুযায়ী, ‘জে’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় শেষ ৩২-এ আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ। বর্তমানে সেই জায়গায় অবস্থান করছে লাতিন আমেরিকার আরেক পরাশক্তি উরুগুয়ে। শেষ ৩২-এর সেই ম্যাচ হবে আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায়। তবে গানিতিক হিসেবে এখনই উরুগুয়েকে চূড়ান্ত প্রতিপক্ষ বলা যাচ্ছে না। ‘এইচ’ গ্রুপের শেষ রাউন্ডে মুখোমুখি হবে দুই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ে। অন্য ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে লড়বে কেপ ভার্দে। এই দুই ম্যাচের ফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত প্রতিপক্ষ চূড়ান্ত হবে।
ডালাস স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই আকাশী-সাদা সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ম্যাচের ৮ম মিনিটেই প্রথম রোমাঞ্চের সৃষ্টি হয়, যখন অস্ট্রিয়ার ডি-বক্সের ভেতর ফরোয়ার্ড লাউতারো মার্টিনেজকে ফাউল করা হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে মেসির নেওয়া স্পট-কিকটি পোস্টের ডান পাশ দিয়ে বাইরে চলে যায়। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি মেসির তৃতীয় পেনাল্টি মিস, যা আসরের ইতিহাসে কোনো একক খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।
তবে এই ধাক্কা আলবিসেলেস্তেদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারেনি। ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে ফাকুন্দো মেদিনার বাড়ানো দারুণ এক পাস থিয়াগো আলমাদার বুদ্ধিমত্তায় নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। বাম পায়ের নিখুঁত শটে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগারকে পরাস্ত করে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমেই জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসেকে (১৬ গোল) টপকে পুরুষ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েন মেসি।
দ্বিতীয়ার্ধে রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলতে শুরু করে। ম্যাচের ৭৭তম মিনিটে মাঝমাঠে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আর্জেন্টিনার ফাকুন্দো মেদিনা ও অস্ট্রিয়ার কনরাড লাইমারকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। অস্ট্রিয়ার একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে কোচ লিওনেল স্কালোনি ডিফেন্সে রদবদল এনে লিয়েন্দ্রো পারেদেস ও নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে মাঠে নামান। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে অস্ট্রিয়ার উইঙ্গার প্যাট্রিক উইমারের একটি বিপজ্জনক হেড পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে গেলে নিশ্চিত রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে (৯৫ মিনিটে) যখন অস্ট্রিয়ার সব খেলোয়াড় কর্নার থেকে গোল করতে আর্জেন্টিনার বক্সে অবস্থান নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এক বিধ্বংসী কাউন্টার-অ্যাটাক করে আর্জেন্টিনা। হুলিয়ান আলভারেজের শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলেও ফিরতি বল ডি-বক্সের ভেতর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে জাল খুঁজে নেন মেসি।
এই দ্বিতীয় গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮-তে। তিনি ব্রাজিলের নারী ফুটবল কিংবদন্তি মার্তাকে (১৭ গোল) ছাড়িয়ে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন। একই সাথে মিরোস্লাভ ক্লোসেকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডও এখন এককভাবে মেসির দখলে। নিজের ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগে করা এই জোড়া গোলে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে। আগামী শনিবার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ জর্ডান।