বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “আজকের রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন হলো দেশের মূল সংকট কোথায়? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার ও সংসদ গঠিত হলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। কিন্তু গত পাঁচ মাসে দলীয়করণ, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ভিন্নমতের ওপর নিপীড়ন যেভাবে ফিরে আসছে, তাতে প্রশ্ন জাগে আমরা কি আবারও সেই পুরোনো অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছি?”
তিনি বলেন, “যে দলীয়করণ ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে রক্ত দিয়েছি, হাজারো মানুষ জীবন দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে পাঁচ কোটি মানুষ ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছেন। এই গণভোট জনগণের সরাসরি রায়ের প্রতীক, যা যেকোনো সংসদীয় আইনের চেয়েও শক্তিশালী। সুতরাং গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে।”
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে দিনাজপুর শিল্পকলা একাডেমিতে দিনাজপুর জেলা ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোট: জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকারের দায় ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “অনেকে দাবি করছেন এই সংস্কার ও গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নির্বাচন, গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনি কাঠামো নির্ধারিত হয়েছিল। আমাদের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশ আইনের মর্যাদা লাভ করে। তদুপরি, সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের যে অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে, সেটিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্ব এড়িয়ে কেবল সাধারণ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চাইছেন, যা জুলাই সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো গণভোটে দেওয়া জনগণের পাঁচ কোটি ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায় এবং ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দলীয় নিয়োগ বন্ধ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। গণভোটের গণরায় এড়িয়ে গিয়ে পুনর্গঠিত ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথে তীব্র গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।”
সবশেষে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সাম্য, ইনসাফ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
দিনাজপুর জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আনিসুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলাল এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, রংপুর জেলা আমীর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী এমপি এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও দিনাজপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাদ্দিস ড. এনামুল হক।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিমের সদস্য ও দিনাজপুরের সাবেক জেলা আমীর মো. আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক জেলা আমীর মো. আফতাব উদ্দীন মোল্লা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. রাজিবুর রহমান পলাশ, দিনাজপুর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক শামছুল মুক্তাদির, জাগপার কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরুল কায়েস রুপম, জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট মাইনুল আলম, দিনাজপুর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ এ কে এম আফজালুল আনাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা, এনডিএফের সাধারণ সম্পাদক ডা. আফসার আল মাহমুদ, দিনাজপুর শহর আমীর মাওলানা মো. সিরাজুস সালেহীন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মো. একরামুল হক আবীর, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি মো. জাকিরুল ইসলাম, দিনাজপুর শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাসুদ রানা এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের হাবিপ্রবি শাখার সভাপতি মো. রেজওয়ানুল হকসহ ১১ দলীয় ঐক্যের দিনাজপুর জেলার নেতৃবৃন্দ।