যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাস্তবায়ন এবং নিজেদের আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের তহবিল ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আজ বুধবার কাতারের রাজধানী দোহায় আলোচনা শুরু করছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, আজ বুধবার দোহায় কাতার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারকের বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে ইরানের আটকে থাকা বা অবরুদ্ধ সম্পদ ও তহবিল অবমুক্ত করার বিষয়টি এই বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। তবে একই সময়ে মার্কিন প্রতিনিধিদল কাতারে অবস্থান করলেও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের সরাসরি কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই বলে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছেন, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইতিমধ্যে কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য দোহায় পৌঁছেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানি কর্মকর্তাদের কোনো যৌথ বা মুখোমুখি বৈঠক হচ্ছে না। ইরানের অবরুদ্ধ তহবিলের বিষয়ে কাতারের মুখপাত্র আরও জানান, দেশটির ৬ বিলিয়ন বা ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের যে তহবিল আটকে রয়েছে, তা এখনো তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তবে চলমান আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনেই এই বিপুল অর্থ পর্যায়ক্রমে হস্তান্তর করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কাতারের এই মধ্যস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সিএনএন, আল জাজিরা, এপি, রয়টার্স।
উপযুক্ত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে লঙ্ঘন করে, তবে তার ‘উপযুক্ত ও চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। এই চুক্তি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিতে কাতার সফরে যাচ্ছে দুই দেশের প্রতিনিধি দল। আর ঠিক এমন সময়েই তেহরানের পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা দেওয়া হলো। তেহরানে আয়োজিত এক সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাঈল বাঘেই সাংবাদিকদের বলেন, আমরা যেকোনও পদক্ষেপকে ছেড়ে দেব না। ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী ইতোমধ্যে যেভাবে প্রমাণ করেছে, ঠিক সেভাবেই ইরানের লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর যেকোনও ধরনের আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় জবাব দেওয়া হবে। মুখপাত্র বাঘেই আরও সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের যেকোনও পদক্ষেপ সমঝোতা স্মারকের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। স্বাভাবিকভাবেই, যদি এই ধরনের চুক্তি লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং তা অব্যাহত থাকে, তবে চলমান এই শান্তিপ্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হবে।
সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন
করছে না যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের ক্ষেত্রে কোনও শর্ত থাকার কথা নয় বলে দাবি করেছেন তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব রয়েছে কোনও শর্ত ছাড়াই দ্রুত ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করার। কিন্তু ওয়াশিংটন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। দারেইনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র কোনও শর্ত ছাড়াই ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবিলম্বে ছাড়তে বাধ্য। কিন্তু তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি।” তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে রয়েছে পারস্পরিক আস্থা তৈরির পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা।
ইরানি এই গবেষকের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী নিজেদের দায়িত্ব পালন করছে না। এর ফলে চলমান আলোচনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র কী করছে তা লক্ষ্য করুন। সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পক্ষ থেকে এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকেও সব ফ্রন্টে যুদ্ধ ও সামরিক অভিযান বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তারা ইসরাইল ও লেবাননের সঙ্গে আলাদা একটি চুক্তি করেছে, যা ওই সমঝোতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকটি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করছে না।