প্রতিবেশী দেশ ভারতে সাংবিধানিক ও আইনি শাসনের পরিবর্তে উগ্রবাদী উন্মত্বতা সকল সময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যা দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য ও গণতান্ত্রিক চরিত্রকে বিতর্কিত ও কলঙ্কিত করেছে। সম্প্রতি দেশটিতে উগ্রবাদী তৎপরতা এতোই বেড়েছে যে, সেদেশের সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমরা নিজেদের জানমাল সহ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিষয়টিকে দেশটির জাতীয় ক্ষয়রোগ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ক্ষয়রোগ যেমন ব্যক্তির জীবনী শক্তির বিনাশ করে, ঠিক তেমনিভাবে আইন ও সাংবিধানিক শাসনের অনুপস্থিতি এবং ধর্মান্ধতা রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল ও জাতিস্বত্ত্বাকে রীতিমত দুর্বল করে দেয়।
সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তার বিরুদ্ধে নিকট অতীতেই দুর্নীতি ও প্রতারণা করে সাধারণ মানুষের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে মামলাও হয়েছিলো। নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দিয়ে। এ জন্য নানাবিধ ছল-চাতুরীরও আশ্রয় নেয়া হয়ে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করা হয় নির্বাচন ম্যানিপুলেট করার জন্য। ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেয়ার ঘটনাও বিশেষ ভূমিকা রাখে এ বিজয়ের পেছনে।
নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, বাংলাদেশী অভিবাসীদের অর্থাৎ বাংলায় কথা বলেন এমন মুসলমানদের ফেরত পাঠাবেন। এটি মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসূচি। কিন্তু মাত্র ক’দিন আগে এমন ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশী’ তকমা দিয়ে ঠেলে পাঠানো একজন নারী আসলে ভারতের নাগরিক। এ ঘটনা বলে দেয়, মূলত ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যা দেশটির আদর্শিক দেউলিয়াত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভারতে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে। এজন্য কখনো ধর্ম, কখনো বর্ণ, আবার কখনো মানুষের বোধ-বিশ্বাসকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। পদদলিত করা হচ্ছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবতাকে। যা কোন গণতান্ত্রিক, সভ্য ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য নয়। ভারতকে বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মনে করা হলেও সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে তার প্রতিফলন প্রশ্নাতীত হয়নি। এর সাথে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার। সে ধারাবাহিকতায় গোমাতার মর্যাদা রক্ষার নামে মানবতাকে লাঞ্চিত করা হচ্ছে; ‘জয় শ্রীরাম’কে বানানো হয়েছে জাতীয় স্লোগান। মুসলিম আমলের স্থাপনা ও সংখ্যালঘুদের বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে। দেশকে মুসলিমশূন্য করার জন্যই কথিত এনআরসি’র অপব্যবহার শুরু হয়েছে।
উগ্রবাদীরা ভারতে বিশ্ব ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অবতারণা করেছে। ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট ২০১৯ সালে প্রদত্ত এক রায়ে মোঘল আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের নির্দেশ দেয়। প্রদত্ত এ রায়ে দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার কথা বলা হলেও তা ‘মাছের মায়ের পুত্রশোক’ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, ঘোষিত রায়ে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের পরিবর্তে উগ্রবাদ ও অন্ধবিশ্বাস আনুকূল্য পেয়েছে। সেখানে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনকে বিবেচনায় আনা হয়নি বলে সচেতন মহলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ভারতের আধ্যত্মিক নেতা ও পণ্ডিত স্বামী অগ্নিবেশের বক্তব্য থেকে। তার ভাষায়, ‘বাবরী মসজিদ-রাম মন্দির ইস্যু কোন ধর্মীয় ইস্যু নয় বরং এটি একটি হীন রাজনৈতিক ইস্যু। এমন অপরাজনীতি বন্ধ হলেই বরং দেশের সকল ধর্ম, মত ও পথের মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। কিন্তু রাজনীতিকদের তা মোটেই পছন্দ নয়। তাদের দরকার ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ভোট বাগানো; আখের গোছানো’।
বারবী মসজিদ ও রামমন্দির বিতর্কের একজন জোরালো সাক্ষী হচ্ছেন আধ্যাত্মিক গুরু স্বামী অগ্নিবেশ। তিনি বিষয়টি নিয়ে কিছু তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘বাবরী মসজিদ ধ্বংসের ঠিক আগ মুহূর্তে বিষয়টির একটি সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল। প্রস্তাবে উগ্রবাদীদের জানানো হয়েছিল যে, বাবরী মসজিদের পৌণে তিন একর জমির পরিবর্তে রাম মন্দির নির্মাণের জন্য তারা মসজিদের পাশেই ইচ্ছামত ৭০ একর পর্যন্ত জমি গ্রহণ করে সঙ্কটের একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে যেতে পারেন। এ প্রস্তাবের বিপরীতে ভারতের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদভানী বলেছিলেন, বাবরী মসজিদের মিম্বর তথা যেখানে দাঁড়িয়ে ঈমাম সাহেব খুৎবা দেন ঠিক সেই জায়গায় ভগবান রামচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল। তাই মন্দিরটা সেখানেই হতে হবে। লালজির কাছে জানতে চাওয়া হয় যে, ১৫২৮ সালে মোঘল সেনাপতি মীর বাকী কি রামমন্দির ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? তুলসী দাসের ‘রাম চরিত মানস’, গুরু গোবিন্দ, স্বামী দয়ানন্দ স্বরস্বতী ও বিবেকানন্দের লেখনীর মধ্যে কোথাও সেকথার সমর্থন পাওয়া যায়? এমনকি ছত্রপতি শিবাজী মোঘল সম্রাট আরঙ্গজেবের সাথে সারাজীবন যুদ্ধ করেই কাটিয়েছেন। তিনি কখনো বলেছেন কী রাম মন্দির ভেঙে বাবরী মসজিদ বানানো হয়েছে’? এসব প্রশ্নে লালজি নিরুত্তরই থেকেছেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে উগ্রবাদের উত্থান দেশটির রাষ্ট্রীয় চরিত্রকেই বদলে দিয়েছে। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতা। বিষয়টি শুধু বাবরী মসজিদ কেন্দ্রীক নয় বরং এই উগ্রবাদী মাতমের পরিসর অনেকটাই বিস্তৃত। এসব ক্ষেত্রে আইন, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতাকে তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। সে ধারাবাহিকতায় চলতি দশকে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিষয়ক ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে ঐ অঞ্চলটিকে পুরোপুরি ভারতভুক্ত করা হয়েছে।
২০১৫ সালে প্রদত্ত এক রায়ে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এমনই সিদ্ধান্ত দিয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের হাইকোর্ট। এ রায়ে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা পরিবর্তন, বাতিল ও সংশোধনযোগ্য নয় বলেও আদালতের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়, ‘Kashmir is not
part of India and thus can not be amalgamated in India. Under the article of 370 constitution, Kashmir is an autonomous area.
চলতি দশকেই আসামের এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ১৯ লাখ ভারতীয় নাগরিক। কথিত এনআরসি’র সেদেশ থেকে মুসলিম বিতাড়নের পরিকল্পনা স্পষ্ট তা ক্ষমতাসীন দলের একধিক নেতার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। তাদের ভাষায়, ‘এনআরসি থেকে বাদ পড়া মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী। আর হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টানরা অভিবাসী’। তবে একথা নিয়ে ভিন্নমত বেশ জোরালো। এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের আরেক নেতার বক্তব্য হচ্ছে, ‘এ রাজ্যে বহু অনুপ্রবেশকারী এসেছেন বাংলাদেশ থেকে। ‘২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান, পার্সি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণে অন্য দেশ থেকে এখানে এসেছেন, তাদের তাড়ানো যাবে না।....তিনি পাশাপাশি একথাও বলেছেন, এনআরসিতে নাম না থাকলেও তাদের তাড়ানো হবে না এ রাজ্য থেকে। শুধু তাদের ভোটাধিকারসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা মিলবে না। তার ভাষায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের ১০০টি বিধানসভা আসনে মুসলিম ভোটের প্রভাব রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের প্রভাব রয়েছে। ফলে এসব সংখ্যালঘুদের এড়িয়ে ভোটে জেতা সম্ভব নয়।’ আসামের পর পশ্চিম বাংলায়ও এনআরসি করার জিকির শুরু হয়েছে বেশ আগেই। পশ্চিম বাংলার বিজেপি সভাপতি দিলিপ ঘোষ তো বলেই দিয়েছে, সেখানে এনআরসি হলে বাদ যাবে ২ কোটি মানুষ’। আর এখানেই এনআরসির মাজেজা খুবই পরিষ্কার। কিন্তু ক্ষমতা হারানো তৃণমূলের বিরোধীতার কারণে তা মোটেই সম্ভব হয়নি।
উগ্রবাদীরা ভারতে মুসলিম আমলের স্থাপনাগুলোকেও বিশেষভাবে টার্গেট করেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে নাম পরিবর্তনের অপরাজনীতি। সে ধারাবাহিকতায় তারা উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ ও ফৈজাবাদের পর আগ্রার নাম পরিবর্তন করে ‘আগ্রাওয়াল’ রাখার দাবি তুলেছেন। শুধু উত্তরপ্রদেশই নয়, হায়দরাবাদ, আহমেদাবাদ, আজমগড়, আলীগড়, মুজাফফরনগরসহ বেশ কিছু শহরের নাম বদলের ঘোষণা দিয়েছে উগ্রবাদীরা। ফৈজাবাদের নাম বদল করে ‘অযোধ্যা’ করা হয়েছে বেশ আগেই। এদিকে ভারতের মহারাষ্ট্রের স্কুল পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে মুঘল আমলের ইতিহাস। যুক্ত হয়েছে হিন্দু শাসক ছত্রপতি শিবাজীর ইতিহাস।
তাজমহল নিয়ে উগ্রবাদী ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিনের। হিন্দু ইতিহাসবিদ পিএন ওক ১৯৮৯ সালে প্রকাশ করা ‘তাজমহলঃ দ্য ট্রু স্টোরি’ গ্রন্থে এ সৌধকে ‘তেজো মহল’ ও একটি হিন্দু মন্দির দাবি করেছেন। তার মতে, সম্রাট শাহজাহান এটি দখল করে সেটিকে পরে তাজমহল নাম দিয়েছেন। উগ্রবাদীদের দাবির মুখে তাজমহলের অভ্যন্তরের ‘তাজ মসজিদ’এ শুধু জুমাবার ছাড়া নামাজ পড়া ইতোমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ইতিহাসবিদ রানা সাফভি বলেছেন ঠিক তার বিপরীত কথা। তার মতে, ‘....তাজমহল তৈরি হওয়ার আগে সেখানে হিন্দু শাসক জয় সিং-এর একটি ‘হাভেলি’ ছিল। শাহজাহান জয় সিং-এর কাছ থেকে হাভেলিটি কিনে নেন। এ নিয়ে একটি ‘ফরমান’ জারি করা হয়েছিল। সেটা এখনো আছে।’
হিন্দুত্ববাদীদের দাবির অসারতা প্রমাণ হয় একজন ফরাসী পর্যটক ফ্রান্সিস বেরনিয়ার (François Bernier) স্মৃতিচারণ থেকে। ১৬৬৩ খ্রিষ্টাব্দে আগ্রা ভ্রমণ করে ফরাসি এ পর্যটক তার স্মৃতিচারণ করে লেখেন-
‘I shall finish this letter with a description of the two wonderful mausoleums which constitute the chief superiority of Agra over Delhi. One was erected by Jehan-guyre [sic] in honor of his father Ekbar; and Chah-Jehan raised the other to the memory of his wife Tage Mehale, that extraordinary and celebrated beauty, of whom her husband was so enamoured it is said that he was constant to her during life, and at her death was so affected as nearly to follow her to the grave’.
অর্থাৎ ‘দু’টো বিস্ময়কর সমাধির বিবরণ দিয়ে আমি চিঠিটি শেষ করবো যা আগ্রাকে দিল্লীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ করেছে। একটি নির্মাণ করেছেন সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর পিতা আকবরের সম্মানে এবং অন্যটি সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রীর স্মরণে তৈরি করেছেন ‘তাজমহল’, যা অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী, স্বামী তাঁর স্ত্রীর শোকে এতই শোকার্ত যে স্ত্রী জীবনে যেমন তার সাথেই ছিলেন, মরণেও তিনি তার কবরের কাছেই থাকবেন’।
অবশ্য সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে বাবরী মসজিদ বিষয়ক ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের রায়। যা ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষয়রোগকে একেবারে অনিরাময়যোগ্য করে তুলেছে। বাবরী মসজিদ সংক্রান্ত সুপ্রীম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে কোলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবী বাবু অরুণাভ ঘোষের বক্তব্য হলো, ‘এমন নিকৃষ্টমানের লজ্জাজনক রায় অতীতে কখনো দেখা যায় নি। রায়টি আইনের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিহীন ও সাংঘর্ষিক। সুপ্রীমকোর্ট নিজের মুখে নিজেই কালি মাখিয়েছে। অযোদ্ধায় রামের জন্ম হয়েছে বলে দাবি করা হলেও রামের অস্তিত্ব প্রমাণিত নয়। এ বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতে বিবেচনায় আনা হয়নি। শুধু হিন্দুদের বিশ্বাসকে বিবেচনায় আনা হয়েছে। অথচ বাল্মিকীর রামায়ণে রামকে কখনো ভগবান বলা হয়নি। তুলসীদাসও তার রচিত রামায়নে কখনো বলেননি যে অযোদ্ধার ঐ জায়গায় রামের জন্ম হয়েছিল’।
ঘোষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রত্মত্ত্ববিষয়ক এএসআই-এর রিপোর্ট ও হিন্দুদের বিশ্বাসকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এএসআই দাবি করেছে যে, মসজিদের তলায় দশম শতাব্দী থেকে কাঠামোগত নির্মাণের ধারাবাহিক উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। তাদের মতে, ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া ঘট বা কলস, হাতি, কুমির বা কচ্ছপের টেরাকোটা মূর্তি মন্দিরের উপস্থিতিকেই প্রমাণ করে। প্রত্মতত্ত্ববিধদের একাংশের দাবি, কুমিরের মুখওয়ালা জল বেরোনোর রাস্তাও প্রমাণ করে, এখানে এক সময়ে মন্দির ছিল। সাধারণত, মসজিদে এ রকম দেখা যায় না।
প্রত্মতত্ত্ববিদদের এমন দাবি বিতর্কমুক্তও থাকেনি। সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের দুই প্রতিনিধি প্রত্মতত্ত্ববিধ সুপ্রিয়া বর্মা ও জয়া মেনন এএসআই-এর রিপোর্টকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, এএসআই-তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল ৫০টি স্তম্ভ কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, স্তম্ভের গোড়াগুলো ভাঙা এবং স্তম্ভের ভিতরে কাদা-মাটি ছাড়া কিছু নেই। রিপোর্টে পশ্চিম দিকের একটি দেয়ালের উল্লেখ করা হয়েছে। মেননদের বক্তব্য, এ ধাঁচের দেয়াল মসজিদেরই বৈশিষ্ট্য। খননকাজের সময়ে অযোধ্যায় গিয়েছিলেন রোমিলা থাপার, রামশরণ শর্মা, ডি এন ঝা-র মতো ইতিহাসবিদরা। তারাও এএসআই-এর দাবিকে ত্রুতিযুক্তই বলেছেন। কিন্তু ভারতীয় সুপ্রীমকোর্ট এসব কথাকে বিবেচনায় না নিয়ে শুধুই এএসআই-এর বক্তব্যকেই আমলে নিয়েছে।
ভারতীয় শীর্ষ আদালতের বক্তব্য হচ্ছে, ‘সমস্ত ঘটনাপ্রবাহ মিলিয়ে দেখলে বাইরের চবুতরায় হিন্দুদের দখল স্পষ্ট প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।’ ভেতরের অংশ নিয়ে শীর্ষ আদালত বলেছে, ‘১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা অযোধ্যা দখলের আগে পর্যন্ত হিন্দুরা যে সেখানে পূজা করত এ সম্ভাবনাই ভারী।’ ‘ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মাণের সময়কাল থেকে ১৮৫৭ সালের আগে পর্যন্ত একমাত্র তারাই যে ভেতরের অংশের কর্তৃত্ব ভোগ করত, সে কথা প্রমাণ করতে পারেনি মুসলিম পক্ষ।’ একই সাথে ভারতের শীর্ষ আদালত বলেছে, ‘মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি হয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ তা ছাড়া বাবরি মসজিদের জমির মালিকানার পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ সুপ্রিম কোর্ট স্বীকার করেছে। ১৯৪৯ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে নিয়মিত নামাজ আদায়ের বিষয়টিও বিচারকরা স্বীকার করেছেন। এমনকি শীর্ষ আদালত ১৯৪৯ সালে মসজিদ অভ্যন্তরে রাম ও সীতার মূর্তি স্থাপন এবং ১৯৯২ সালে মসজিদ ধ্বংস অপরাধ আখ্যা দিয়েছেন।
তাহলে কোন যুক্তিতে বাবরি মসজিদের এ স্থান তুলে দেয়া হলো হিন্দুদের হাতে তা কারো কাছেই বোধগম্য হচ্ছে না। ২.৭৭ একর জমির পরিবর্তে মুসলিম পক্ষকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫ একর জমি দিতে বলা হয়েছে অযোধ্যাতেই। অথচ শরীয়াহ মোতাবেক মসজিদের জমি বিনিময়যোগ্য নয়। মূলত বিরোধটা মসজিদ নিয়ে, জমি নিয়ে নয়। রায়ে আরো বলা হয়েছে, ‘বাবরি মসজিদ ভেঙে রামলালার মূর্তি স্থাপনের মধ্য দিয়ে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে’। অথচ সে আইন লঙ্ঘনকারীদের কোনো শাস্তি না দিয়ে তাদের হাতেই বাবরি মসজিদের স্থানটি তুলে দেয়া হয়েছে! এমনকি আদালতের রায়ে বলা হয়, ‘মসজিদের নিচে স্থাপনা থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি মন্দির কি না, তা নিশ্চিত নয়’।
অপরদিকে মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিমদের অন্য জায়গায় পাঁচ একর জমি দেয়ার পক্ষে আদালতের বক্তব্য হচ্ছে, ‘১৯৪৯ সাল থেকে এ বিতর্কিত জমির মালিকানা নিয়ে লড়ছে মুসলমানরা। অযোধ্যার ওই জমিতে তারা নামাজ পড়তেন এ প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে পুরাতত্ত্ব বিভাগের দাখিল করা তথ্যে। তাই মুসলমানদের ওই জমির অধিকার না দেয়া হলেও তাদের মসজিদ তৈরির অধিকার না দেয়া হলে সেটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সংবিধানবিরোধী। তাই আইন মেনেই মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের জন্য পাঁচ একর জমি দেয়া হয়েছে’। আদালতের এমন বক্তব্যকেও কেউই গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না। কারণ, এক ধর্মের উপাসনালয় ভেঙে অন্য ধর্মের উপাসনালয় তৈরি করা কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ও সংবিধানসম্মত হওয়ার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভা নির্বাাচনে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ক্ষমতায় এসে রাজ্যটিতে মুসলিম উৎখাতের মিশনে নেমেছে। নতুন সরকার রাজ্যটিতে গরু জবাইয়ের ওপর নিশেধাজ্ঞা জারি করায় এবার ঈদে মুসলমানরা গরু কুরবানি দিতে পারেননি। এমনকি বিভিন্ন স্থানে নামাজ পড়তেও বাধা প্রদান করা হয়েছে। গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনা সহ মসজিদ ও মাদরাসা। যা কথিত গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কোন দেশ ও জাতিস্বত্ত্বা সামনের দিকে এগুতে চাইলে শাসন প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই ধর্ম, বর্ণ, মত, পথ নির্বিশেষ সকল মানুষকে এক জাতীয়তাবোধে ঐক্যবদ্ধ করা জরুরি। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রতিবেশী দেশ ভারতে উগ্রবাদ ও বিভাজনের রাজনীতি উত্থান ঘটেছে। আর এভাবে জাতিকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে দেশটি কোন গন্তব্যে পৌঁছতে চাচ্ছে তা কারো কাছেই বোধগম্য নয়। তবে বিষয়টি যে দেশটির ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষয়রোগ’ তা মোটামোটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।
www.syedmasud.com